লাইব্রেরিতে পুরোনো কিছু বই খুঁজলে এমনকি বর্তমানে ইন্টারনেটে খুঁজলেও কালি তৈরির বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল কম্পোজিশন পাওয়া যায়। তবে মজার ব্যাপারটি হলো জেনুইন কম্পোজিশনটা কেউ জানায় না! বইপত্রে যা পাওয়া যায় তাতে কালি তৈরি হবে বটে, তবে উন্নতমানের কালি পাওয়া সম্ভব নয়। কালির কেমিক্যাল কম্পোজিশনের ব্যাপারটা আসলে কেমিস্ট বা প্রস্তুতকারীর একান্তই নিজস্ব। এজন্যই একই ক্যাটাগরির কালির (যেমন, আয়রন গল, পিগমেন্ট কিংবা ডাইবেজড অন্যান্য কালি) গুণগত বিভিন্নতা দেখা যায়। এই বিভিন্নতার মূল কারণ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এভাবে-
- এক-এ চন্দ্র (১): ধরুন আপনি কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করতে চান। উন্নতমানের প্রয়োজনীয় সকল মসলা ও অন্যান্য উপকরণ আপনার রান্নাঘরে রয়েছে। চাল, মাংস, টকদই, আলুবুখারা, নানাবিধ মসলা একসাথে হাড়িতে মিশিয়ে চুলায় চাপিয়ে দিলেন। হবে? হবে না। কোন মসলা কখন দিতে হবে, কোনটা কখন আলাদা করে কীসের সাথে মিশিয়ে নিতে হবে তা জানা চাই! কালি তৈরিতেও মূল রহস্য এটিই। কী কী উপাদান লাগবে তা জানলেই আপনি সব জোগাড় করে হাড়িতে চাপিয়ে দিলেন আর কালি হয়ে গেলো? হবে না স্যার! আপনাকে জানতে হবে উপাদানগুলো কয়টি সেগমেন্টে, কোনটার সাথে কোনটা আগে পৃথকভাবে মিশিয়ে নিয়ে, তারপর সব একসাথে করতে হবে। উপাদান মিশ্রণের পর্যায়গুলো কালি তৈরিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পর্যায় সবাই জানে না। বাংলাদেশি সুলেখার মালিকদের এখনকার প্রজন্মও জানে না (গবেষক আমীন বাবুর পুস্তকের সূত্রে এই তথ্যটি জানলাম)। সরি-টু-সে, বাট, আমি জানি স্যার! খুঁজতে থাকুন বাংলাদেশে আর কেউ জানে কি না! অনেকেই ভাবে, এ-আর এমন কী! খুঁজলেই পাওয়া যায় এসব ফর্মুলা! খুঁজুন, কালি তৈরি করুন। কেউ কালি তৈরি করলে তো আমাদেরই ভালো! দু-দশ টাকায় কালি কিনতে পারব। সেই কালিতে লিখব সোনার নিবের কলম দিয়ে।
- দুই-এ পক্ষ (২): ফাউন্টেন পেনের কালি আর চামড়ায় রং করার কালি (ট্যাটু ইঙ্ক) এক নয়! ইচ্ছেমতো রং মেশালেন আর হয়ে গেলো! হবে না স্যার। ভাবছেন কাপড়ে দেওয়ার নীল দিয়েই ভালো মানের নীল কালি বানিয়ে ফেলা সম্ভব? তা সম্ভব নয়। এর জন্য বিশেষ এক ডাই রয়েছে। সেটাকে আগেকার দিনের ওস্তাদেরা বলতো অ্যাসিড-ব্লু, কেউ কেউ বলতো ক্রিস্টাল ব্লু।
- তিন-এ নেত্র (৩): অনেকেই মনে করেন যে, সালফিউরিক অ্যাসিড কালি তৈরির একটি গোপন উপাদান। একেবারেই তা নয়। আগেকার দিনে, এমনকি বাংলাদেশেও আয়রন গল ইঙ্ক তৈরিতে ৭০-৮০ দশকে সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহৃত হতো কিছু কিছু ক্ষেত্রে। আয়রন গল ইঙ্ক তৈরিতে সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহারের মূল কারণটি ছিল টেনিন, টেনিক অ্যাসিড ও ফেরাস সালফেটের বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করা। মানে হলো সালফিউরিক অ্যাসিড প্রভাবক হিসাবে কাজ করতো। কিন্তু, সালফিউরিক অ্যাসিড খুবই করোসিভ হওয়ার কারণে কলমের নিব, বিশেষকরে গোল্ড নিব, এবং কলমের ক্যাপিলারি সিস্টেমের অন্যান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কাজেই সৌখিন ব্যবহারকারীরা সালফিউরিক অ্যাসিড রয়েছে এমন কালি ব্যবহার করতে চাইতো না। এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের দুএকটি কোম্পানি চেষ্টা করে এবং সফলতাও পায়। তন্মধ্যে একটি হলো এভারেডী। আর একটি হলো বাড়ির উঠোনই ছিল যার প্রোডাকশান ইয়ার্ড, প্রগতি। এভারেডী পরবর্তীতে বহুদিন টিকে থাকলেও, প্রগতি টিকে থাকতে পারেনি। সে যাইহোক, সমাধানটি কী? অর্থাৎ বিকল্প প্রভাবক হিসাবে কী ব্যবহার করা যায়? হাইডোক্লোরিক অ্যাসিড। এটি বাতাসে মিলিয়ে যায়, তাই কালিতে এর উপস্থিতি পরবর্তীতে আর থাকে না তেমন। আবার প্রভাবক না ব্যবহার করলেও তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না! কাজেই নাও ব্যবহার করা যায়। লার্জ স্কেলের প্রোডাকশানের জন্য প্রভাবক প্রয়োজন বটে। তবে ২০/৩০ গ্যালন তৈরির জন্য প্রভাবক না হলেও চলে।
- চার-এ বেদ (৪): কালি তৈরিতে উপাদানগুলোর রাসায়নিক বিক্রিয়া, এবং মিশ্রণের পর্যায়ক্রম আপনাকে জানতেই হবে। না হলে, উন্নত, ভালো মানের কালি প্রস্তুত করা সম্ভব নয়।
- পাঁচ-এ পঞ্চবাণ (৫): যে-কোনো কালির শেলফ লাইফ বৃদ্ধিতে কালি তৈরির সময় আপনাকে বায়োসাইড ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে বায়োসাইড ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়। বায়োসাইড ব্যবহার না করার কারণে আধুনিক কালির শেলফ লাইফ কম।
- ছয়-এ ঋতু (৬): কালি তৈরিতে সকল কেমিস্ট যে উপাদানগুলো একই অনুপাতে প্রয়োগ করে তা কিন্তু নয়। যার-যার কম্পোজিশন তার-তার নিজস্ব। এই নিজস্বতা অর্জিত হয় ট্রায়াল-অ্যান্ড-ইরোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। আমাদের ছোটবেলায় মাটির চারি থেকে গ্যালন গ্যালন কালি তুলে ফেলে দিতে দেখেছি।
- সাত-এ সমুদ্র (৭): আমি সৌভাগ্যবান। আমি কালি তৈরিতে উপাদানগুলোর মিশ্রণ পর্যায়ক্রম এবং উপাদানগুলোর মধ্যে বিক্রিয়া এবং উপাদানগুলোর কোনটির ভূমিকা কী তা শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
- আট-এ অষ্টবসু (৮) আট ফর নট: হারিয়ে যাক কালের গর্ভে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যা। কে তারে রাখে মনে ফুরালে হায় গন্ধ যে তার....
